দৈনিক অনুসন্ধান
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম মুসলিম অধ্যক্ষ মতলবের ড. নওয়াব আলী
--সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ--
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বাঙালি ও মুসলিম অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নওয়াব আলী ছিলেন বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সমাজসেবক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও এর চিকিৎসাব্যবস্থার অগ্রগতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
তাঁর জীবন, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সমাজসেবামূলক কাজের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষাঃ
ডা. নওয়াব আলী ১৯০২ সালে অবিভক্ত ভারতের (বর্তমানে বাংলাদেশ) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি মুন্সীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষা পাস করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) সম্পন্ন করেন।
তিনি ১৯২৭ সালে তিনি কলকাতার বিখ্যাত ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক (MBBS) ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৩৫ সালে কলকাতা স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তিতে ১৯৪৫ সালে যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৪৬ সালে সেখান থেকে MRCP (এডিনবরা) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে অনন্য অবদানের জন্য তিনি FRCP ডিগ্রি লাভ করেন।
২. কর্মজীবন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ
তিনি একজন প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি দুই মেয়াদে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ঢামেক-এর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল:
প্রথম মেয়াদ: ২১ মার্চ ১৯৫৩ থেকে ১০ এপ্রিল ১৯৫৪ পর্যন্ত।
দ্বিতীয় মেয়াদ: ২১ জানুয়ারি ১৯৫৫ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ পর্যন্ত।
বিশেষ কৃতিত্ব: তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাসের প্রথম বাঙালি এবং প্রথম মুসলিম অধ্যক্ষ (তাঁর পূর্বে এই পদে ব্রিটিশ এবং অমুসলিম চিকিৎসকেরা দায়িত্ব পালন করেছিলেন)। এ ছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
৩. চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবদান ও সমাজসেবা
তৎকালীন চিকিৎসকদের সংগঠন 'অল পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন'-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তিনি আজীবন কাজ করেছেন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (ICDDR,B)-এর অধীনে চাঁদপুরের মতলবে যে বিশ্বখ্যাত ডায়রিয়া বা কলেরা হাসপাতালটি রয়েছে, তার প্রতিষ্ঠায় ডা. নওয়াব আলীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
তিনি গ্রামীণ মানুষের কলেরার চিকিৎসায় এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন।
৪. রাজনৈতিক জীবনঃ
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের (আইনসভা) সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং আইনসভায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখেন।
৫. মৃত্যু ও রাষ্টীয় সম্মাননা
এই মহান চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ ১৯৭৭ সালের ৪ঠা আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে এবং দেশ গঠনে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে বিভিন্ন সম্মাননা প্রদান করেন।
২০০৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি শোক প্রস্তাব পাস করা হয়।
২০০৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম প্রকাশ করে।