দৈনিক গোয়েন্দা সংবাদ
সমুদ্রে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক ও সানস্ক্রিনের রাসায়নিক উপাদান সরানোর একটি বড় সমস্যা হলো, এগুলোকে শুধু জল থেকে আলাদা করলেই দূষণ শেষ হয় না। একটি ছাঁকনি যদি দূষককে আটকে রাখে, তাহলে সেই দূষিত উপাদানকে পরবর্তী ধাপে কীভাবে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় বা ভেঙে ফেলা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক এই জায়গাতেই হাওয়াইয়ের এক স্কুলছাত্রী ভেরা ওয়াংয়ের(Vera Wang) গবেষণা নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ওয়াং নারকেলের বর্জ্য ব্যবহার করে সমুদ্রের জল ছাঁকার একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন। তাঁর ধারণাটি ছিল সরল। নারকেলের আঁশযুক্ত ছোবড়ার ভেতর দিয়ে জল প্রবাহিত হলে এর সূক্ষ্ম ও ছিদ্রযুক্ত গঠন মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো ক্ষুদ্র দূষককে আটকে রাখতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজ বর্জ্যের একটি ব্যবহারও তৈরি হয়। নারকেলের আঁশ ব্যবহার করে তৈরি এই নকশায় স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বয়ন কৌশল থেকেও অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ছাঁকনি তৈরি হওয়ার পরই সামনে আসে আরও কঠিন সমস্যা। নারকেলের ছোবড়ায় আটকে থাকা প্লাস্টিক বা সানস্ক্রিনের উপাদানকে যদি শেষ পর্যন্ত সরাতেই হয়, তাহলে শুধু ছাঁকনি ব্যবহার করে লাভ কতটা? এই প্রশ্ন ওয়াংকে ছোবড়ার ভেতরের অদৃশ্য জীবজগতের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। কারণ নারকেলের আঁশের গঠন এমন যে তার মধ্যে জল ও বায়ু চলাচল করতে পারে। ফলে সেখানে বিভিন্ন অণুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
এই সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে ওয়াং কাজ শুরু করেন অ্যান্টনি অ্যামেন্ডের গবেষণাগারে, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোয়া ক্যাম্পাসে। গবেষণার লক্ষ্য ছিল নারকেলের ছোবড়ায় স্বাভাবিকভাবে থাকা ছত্রাকগুলোকে শনাক্ত করা এবং তারা সানস্ক্রিন ও প্লাস্টিকের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে তা পরীক্ষা করা। ছত্রাক বলতে আমরা সাধারণত ছাঁচ বা মাশরুমকে বুঝি, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলো একটি বিশাল জীবজগতের অংশ। তাদের কিছু প্রজাতি পরিবেশে জটিল জৈব পদার্থ ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
গবেষণায় দেখা যায়, নারকেলের ছোবড়ায় স্বাভাবিকভাবে থাকা কিছু ছত্রাক সানস্ক্রিন ও প্লাস্টিকের উপস্থিতিতে বেড়ে উঠতে পারে এবং এসব দূষকের কিছু উপাদান জৈবিকভাবে ভাঙতে সক্ষম হতে পারে। জৈব অবক্ষয় বা বায়োডিগ্রেডেশন বলতে বোঝায় অণুজীবের রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো পদার্থকে অপেক্ষাকৃত সরল উপাদানে ভেঙে ফেলা। প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিবেশে প্রচলিত অনেক প্লাস্টিক দীর্ঘ সময় ধরে সহজে ভাঙে না।
গবেষকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ ছিল নারকেলের আঁশে থাকা ট্যানিন নিয়ে। ট্যানিন হলো উদ্ভিদে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী কাইলি ক্রিস্টেনসেনের মতে, নারকেলের আঁশের ট্যানিন হয়তো বিশেষ ধরনের ছত্রাকের বৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। অর্থাৎ ছোবড়াটি শুধু দূষক আটকে রাখার জায়গা নয়, এমন একটি ক্ষুদ্র পরিবেশও তৈরি করতে পারে যেখানে দূষক ভাঙতে সক্ষম অণুজীব টিকে থাকতে পারে।
এরপর আসে আরও আকর্ষণীয় একটি ফল। ছত্রাকগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেন, কিছু নমুনার পরিচিতি বিশ্বের বড় জিন ও জিনোম তথ্যভাণ্ডারেও সহজে মেলে না। এর অর্থ নিশ্চিতভাবে নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে এমন নয়। তবে এর মধ্যে আগে ভালোভাবে চিহ্নিত না হওয়া ছত্রাক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের সঠিক পরিচয় এবং তারা কোন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় দূষক ভাঙে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এখানে গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাগারে কোনো ছত্রাক একটি দূষককে ভাঙতে পারছে মানেই সমুদ্রের বিশাল পরিবেশে একই কাজ কার্যকরভাবে করা যাবে, এমন নয়। কত দ্রুত তারা দূষক ভাঙতে পারে, ভাঙার পরে কী কী পদার্থ তৈরি হয়, বিভিন্ন তাপমাত্রা ও লবণাক্ততায় তাদের কার্যক্ষমতা কেমন থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতি নিরাপদ কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও প্রয়োজন।
২০২৬ সালের হাওয়াই স্টেট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ফেয়ারে ওয়াংয়ের গবেষণা মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে প্রথম স্থান এবং সামগ্রিকভাবে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। তিনি ফ্রেন্ডস অব হানাউমা বে, অ্যাসোসিয়েশন ফর উইমেন জিওসায়েন্টিস্টস এবং ম্যাকইনার্নি ফাউন্ডেশনের কাছ থেকেও স্বীকৃতি ও পুরস্কার পান। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
তবে এই কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক পুরস্কার নয়, গবেষণার প্রশ্নটি। একটি প্রাকৃতিক ছাঁকনি দিয়ে দূষক আটকানোর ধারণা থেকে অনুসন্ধান পৌঁছেছে সেই ছাঁকনির ভেতরে বসবাসকারী অণুজীবের কাছে। ভবিষ্যতে যদি এই ছত্রাকগুলোর কার্যপ্রণালি স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং পরীক্ষাগারের বাইরে তাদের ব্যবহার নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি হতে পারে। তখন নারকেলের ছোবড়া শুধু কৃষিজ বর্জ্য হিসেবে নয়, এমন এক ক্ষুদ্র জীবন্ত পরিবেশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব অণুজীবেরা মানুষের তৈরি কিছু দূষককে ভেঙে দেওয়ার কাজে অংশ নেয়।
তথ্যসূত্র: University of Hawaiʻi News; Times of India (15 আগস্ট 2026)।